ইয়েটস ও রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গ

প্রভাত মুখোপাধ্যায় তাঁর ‘রবীন্দ্র-জীবনকথা’য় দুঃখ করে লিখেছেন, ‘আশ্চর্য লাগে ভাবতে ইয়েট্‌সের শেষ বয়সে রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর মানসিক আকর্ষণ প্রায় লোপ পেয়েছিল। ‘ এর কারণ সম্পর্কে প্রভাতকুমার আমাদের কোনও আলো দেন নি, এ বইতেও নয়, তাঁর বৃহত্তর   ‘রবীন্দ্রজীবনী’তেও নয়। রবীন্দ্রনাথের প্রতি ইয়েট্‌সের মানসিক আকর্ষণ কেন লোপ পেয়েছিল তা বুঝতে হলে দুই কবির বন্ধুত্বের পশ্চাৎপটের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। তাঁদের কবি প্রকৃতি ও কাব্যিক পরিণতির কথা মনে রাখলে এবং সংশ্লিষ্ট সব তথ্য উপস্থিত করলে আশ্চর্য হবার কোনও কারণ থাকবে না।

এ প্রবন্ধে দেখা যাবে যে এক বিশেষ অর্থে, প্রাচ্য জীবনের প্রতীক হিসেবে, ইয়েটসের কাছে রবীন্দ্রনাথের মূল্য শেষ পর্যন্ত অম্লান ছিল, যদিচ রবীন্দ্রনাথের ও প্রাচ্যের চিন্তার কোনও কোনও দিকের প্রতি তাঁর কিছুমাত্র আকর্ষণ ছিল না। আরও একটি বিষয়ে আমি রবীন্দ্রানুরাগীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবার চেষ্টা করব: সেটি হল, যখন ইয়েট্‌স রবীন্দ্রনাথের চিন্তা সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করছেন তার কাছাকাছি সময় তাঁর একটি কবিতায় প্রায় রাবীন্দ্রিক অনুভূতি ও চিন্তার আকস্মিক ও বিস্ময়কর উপস্থিতি।

ইয়েটস-রবীন্দ্রনাথ পরিচয়

রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইয়েট্‌সের পরিচয় হয় প্রথম মহাযুদ্ধের দু’বছর আগে। এ সময়টা য়ুরোপীয় সংস্কৃতির এক সঙ্কটকাল। য়ুরোপের মানবতন্ত্রী এবং বিজ্ঞানতন্ত্রী সভ্যতা তখন বিস্ফোরণের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল। এ জটিল সভ্যতার নীচের তলায় ছিল কুটিল ক্ষয়, আর উপর তলায় ছিল কুৎসিত স্বার্থপরতা এবং শূন্যতা। এমন সময় এক অপেক্ষাকৃত সরল অথচ গভীর সংস্কৃতির মর্মস্পর্শী বাণী নিয়ে এলেন রবীন্দ্রনাথ। সংশয়দীর্ণ ও হৃত-প্রত্যয় য়ুরোপীয় চিত্ত তাঁর আনন্দিত উপলব্ধি ও গভীর বিশ্বাসে মুগ্ধ হল।কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইয়েট্‌সের পরিচয়ের ভূমিকাটি দীর্ঘ করে দেয়ার প্রয়োজন আছে। আয়ার্লণ্ডের সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ইতিহাস ইংলণ্ডের থেকে স্বতন্ত্র এবং কোনও কোনও দিক দিয়ে ইউরোপে অনন্য। তাহলেও উনিশ শতকের শেষ দিকে ও বর্তমান শতকের গোড়ার দিকে দু’দেশের লেখক ও ভাবুকদের অনেহে একই আধ্যাত্মিক সমস্যায় পীড়িত হয়েছিলেন। যুক্তিবাদ, বস্তুবাদ, প্রত্যক্ষবাদ ও যান্ত্রিক বিজ্ঞান আত্মাকে অস্বীকার করে, সহজ উপলব্ধিকে সংশয়াক্রান্ত করে এবং কল্পনাকে খর্ব করে অধ্যাত্ম জীবনকে শূন্যগর্ভ করে দিয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতাই প্রভাবক

ডারউইনীয় বিবর্তন তত্ত্ব এবং বাইবেলের ঐতিহাসিক সমালোচনার মুখে বিপন্ন, এবং যুক্তিবাদী প্রোটেষ্টান্ট মানসিকতার কল্পনাহীন ও অসুন্দর আচার অভ্যাসের বাহন, ইসায়ী ধর্ম এ শূন্যতা অনেক ক্ষেত্রেই পূরণ করতে পারে নি। জীবন ও জগতের সার্বিক ব্যাখ্যা হিসেবে, একই সঙ্গে বুদ্ধি, কল্পনা ও আত্মার আশ্রয় হিসেবে, এ ধর্ম অকেজো হয়ে পড়েছিল— ইয়েটসের ভাষায়, ‘এক বাক্স খেলনায় পরিণত হয়েছিল।’ এ আধ্যাত্মিক পরিস্থিতিতে ইয়েট্স ভারতীয় দার্শনিক চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হন মোহিনী চট্টোপাধ্যায়ের দৌত্যে। খৃষ্টের মত প্রিয়দর্শন এই ব্রাহ্মণ যুবক গীতা ও শঙ্করাচার্যের বেদান্তের ব্যাখ্যা করে শতাব্দী-শেষের তরুণ ডাবলিন সমাজের কাছে জ্ঞান, উপলব্ধি ও কল্পনার এক নূতন দিগন্ত খুলে দিয়েছিলেন। এ কথা মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে যে পরবর্তীকালে যে স্বীকৃতি ও মুগ্ধতার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ইয়েটসের পরিচয় হয়েছিল, তার ক্ষেত্র অনেকখানি তৈরী করেছিলেন এই দার্শনিক ব্রাহ্মণ। পরিণত বয়সে ইয়েটস বলেছেন, ‘এলকিবায়ডিস সক্রেটিসের কাছ থেকে পালিয়ে বেঁচেছিলেন পাছে সব ছেড়ে দিয়ে জীবনভর শুধু তাঁর কথাই শুনতে হয়। আর আমি নিশ্চয় করে বলতে পারি, আমরা তরুণেরা, যারা কর্মে ও চিন্তায় অজানাকে খুঁজেছি, তারা ভেবেছি, শুধু এ মানুষটির কথা শোনা আর পরিশেষে তাঁর মতো ভাবতে পারা জীবনের সার্থকতম কাজ।’ বস্তুতঃ গ্রহণে, প্রতিক্রিয়ায়, বর্জনে ভারতীয় ধ্রুপদী দর্শনের এই ব্যাখ্যাকার কবি ইয়েটসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিলেন…

অনুবাদ
মাইশা মালিহা

ইসলামকে নতুনভাবে দেখতে চায় গেজি যুবারা: ইহসান এলিয়াচক

সর্বগ্রাসী ও কর্তৃত্ববাদী পন্থা হিসেবে ইসলামকে মানুষ (ভুল) বুঝেছে। যখনই ইসলাম কোথাও এসেছে, তাকে দেখা হয়েছে ভিন্ন পরিচয়, পছন্দ ও ধর্মের ওপর নিপীড়নের পন্থা হিসেবে। অথচ ইসলামের আগমনে— এমন একটি উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি

save
Please login to bookmark Close
save
Please login to bookmark Close
Scroll to Top

Explore Categorys

Explore pages