
মুসলমানদের বাড়ীগুলি বেশবড়, আর খোলামেলা। প্রত্যেক বাড়ীতেই সুন্দর সুন্দর কোঠা আর হলঘর থাকে । সন্ধ্যাবেলা যাতে হাওয়া আসতে পারে সেইজন্য অনেক বাড়ীরই ছাদ সমতল করে তৈরী করা হয়। যারা সবচেয়ে বড়লোক তাদের বাড়ীর পেছনে কিংবা আরও কিছু দূরে সুন্দর সুন্দর বাগান থাকে । এসব বাগানে ফলমূল, তরী-তরকারী, ফুল আর নানা দুষ্প্রাপ্য গাছ হয়। সবই খুব যত্ন করে সাজান থাকে । বাগানের ভিতর ঢাকা পথ, নানা ছাদে তৈরী ছোট ছোট ঘর আর সবুজ কুঞ্জ ও দেখতে পাওয়া যায়।
কোনও কোনও বাগানে স্নান এবং মাছধরার জন্য পুকুরও থাকে । স্নানের ঘাটগুলি খুব পরিষ্কার। সেখানে মেয়েপুরুষ সবাই রোজ এসে স্নান করে। যারা খুব বড়লোক তারা বাগানের ভিতর সূক্ষ্ম কারুকার্য্য করা পিরামিড-আাকুতি এক ধরণের স্মৃতিসৌধ তৈরী করায়। বিশেষ কৃপণ না হলে এর জন্য তারা যথেচ্ছা খরচ করে। কাদা-মাটি একসঙ্গে মিশিয়ে তা রোদে শুকিয়ে বাড়ীর দেয়াল তৈরী হয় দেখে মনে হয় যেন পোড়া মাটির তৈরী । উপরে গোবর আর চুণ মিশিয়ে পলেস্তারা লাগান হয়। তাতে পোকাধরা বন্ধ করে। সবার উপরে ঘাসপাতা, দুধ, চিনি [ গুড়? ] আর গঁদের তৈরী আর একটা জিনিষ দিয়ে পলেস্তারা দেওয়া হয়। এতে দেয়াল এত পালিশ আর চকচকে হয় যে তার তুলনা নেই।
সাধারণ লোকদের ঘরবাড়ী মাটির সঙ্গে খড় মিশিয়ে তৈরী । এসব বাড়ী খুব ছোট আর নীচু হয়, উপরে কঞ্চির ছাউনী সার মেঝে সার দেয়াল গোবর দিয়ে লেপা ৷ উঁচু ঘর, চিমনী, পাকা ছাদ, খাটপাঙ, কিচ্ছু থাকে না। জানালায় খড়খড়ি, দরজায় ছিটকিনি, হুড়কো তালা—এসবও কিছু থাকে না! কিন্তু তবুও কেউ চোরের উপদ্রবের কথা বলে না।
বড়লোকের বাড়ীর হলঘর কোঠাঘরে সব ইরাণী গালচে আর সূক্ষ্ম কাজকরা মাদূর বিছানো থাকে। কোথাও কোথাও সোণারূপার বাসনও চোখে পড়ে । তাদের খাটের ভিতরট খুব হালকা: এটা সাধারণত: চারপায়ার উপর গদী বিছিয়ে তৈরী করা হয়। স্বামী-স্ত্রী আলাদা বিছানায় ঘুমায় । মেয়েদের একসঙ্গে খাওয়া থাকা শোওয়া-বসা সবকিছুর জন্য একটা আলাদা মহল থাকে। এ বাবদ স্বামীদের—বিশেষ করে তারা পদস্থ লোক হলে,__কি পরিমাণ খরচ হয় ভাবলে অবাক লাগে । কারণ তিন চার জন স্ত্রীর ভরণ’পোষণ আর তাদের প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা নফর-বাঁদী রাখবার খরচ কখনও কম হতে পারেনা। স্বামীরা প্রতিবার কয়েক দিন বা সপ্তাহের খরচ বাবদ কিছু টাকা ধরে দেয়। তা’ছাড়া বাসন-কোসনের জন্য তাদের বেশী কিছু খরচ হয় না। বাসনপত্রের মধ্যে এদের শুধু থাকে কিছু থালাবাটি হাড়ি কড়াই আর এই রকম আর কিছু কিছু জিনিষ।
মুসলমানদের বসবার আসনচৌকি আছে । কিন্তু তারা মাটিতে বিছান সুন্দর মাদূর বা ইরাণী গালচেতে পা মুড়ে বসাই বেশী পছন্দ করে। হুগলী আর পিপলির কয়েকজন খুব বড়লোক ব্যবসায়ী ওলন্ডাজ ব্যবসায়ীদের বসবার জন্য তাদের গুদামে কিছু খেলো চেয়ার রাখে । এ অবশ্যি খুব বেশী বড়লোকদের কথা বলছি। এদের কাছে প্রচুর মালপত্র থাকে—তার মধ্যে বাংলার মিহি কাপড় আর অন্যান্য জিনিস বিশেষ উল্রেষযোগা । এদের ব্যবসা রীতিমত বড় রকমের ।
তাদের সদগুণের মধ্যে [প্রধান ] এই যে তাদের কথার উপর নির্ভর করা যায় এবং তারা খুব বিশ্বাসী । আমরা দেখা করতে গেলে তারা খুব খাতির-যত্ব করত । তাদের দু’জনে বাটাভিয়া থেকে আমাদের জাহাজে এসেছিল—একজনের নাম ছিল হাসান, আর একজনের মহম্মদ । তারা দু’জনেই অল্পস্বল্প ডাচ ভাষা জানত । ফলে পথে অনেক সময়ই আমরা একসঙ্গে গল্পগুজব করতাম।
হুগলীতে থাকার সময় আমরা খুব চেনা লোকের মত তাদের বাড়ী বাওয়া আসা করতাম । তারা সব কিছু নিয়েই আমাদের সঙ্গে খোলাখুলি আলাপ করত । আমাদের তারা আচার আর অন্যান্য ভাল জিনিষ উপহার দিত। বিশেষ করে তারা আমাকে আমাদের, ‘দেশে যা কিছু উল্লেখযোগ্য আছে তার কথা জিগেস করত। এসব নিয়ে আমি যখন কথা বলতাম তখন তারা খুব খুশী হয়ে শুনত।
আমি আমার সাধ্যমত বর্ণনা করতাম—আমাদের সহর, বাড়ীঘর, গীর্জা, মিনারগম্বুজ, দোকানবাজার, জিনিষপত্র, বাবসা, জ্ঞানবিজ্ঞান আর নৌবহরের কথা, আমষ্টার্ডাম সহর আর সেখানে কত লোক থাকে সেই গল্প, মেয়েদের পোষাক, ঋতু হিসাবে দিনরাত্রির দৈর্ঘ, শীতকালের ভীষণ ঠাণ্ডা, বরফপড়া আর লোকে যে শ্লেজগাড়ীতে করে বরফের উপর দিয়ে যায় সেই কথা। শ্লেজগাড়ীর কথা শুনেই তারা সবচেয়ে অবাক হত। তারা বলত—আমি যে সব জিনিষের কথা বলি তা দেখতে তিন হাজার ছয় শ’ লীগ পাড়ি দিয়েও যাওয়া উচিত। ঘোড়া, শ্লেজ, আর বহু লোক জমাট-বাঁধা জলের উপর চলাফেরা করছে—এইটে দেখতেই তাদের সবচেয়ে বেশী কৌতূহল হত।
তারা খ্রিষ্টান না হওয়ায় নরকে যাবে বলে দুঃখপ্রকাশ করলে, তারাও আমার জন্য দুঃখপ্রকাশ করত,—বলত আমি যে পথে চলেছি সেইটেই ভুল পথ, নরকের রাস্তা।
এরা দু’জন মাঝে মাঝে তাদের জাতের সবচেয়ে বড়লোকদের বাড়ীতে আমাদের নিয়ে যেত। সেখানে আমরা খুব খাতির-যত্ন পেতাম । আমাদের তারা তাদের সবচেয়ে সুন্দর হলঘর কি কোঠাঘরে নিয়ে গিয়ে মাদুর বা গালচেতে বসাত । সেখানে আমাদেরও তাদের মত আসন-পিড়ি হয়ে বসতে হত। আমরা প্রাত্যকেই যথাসাধ্য এই কষ্টকর ভঙ্গীতে বসে থাকতে চেষ্টা করতাম। আর বিশেষ চেষ্টা থাকত পায়ের তলাটা বাইরের দিকে বের করে রাখবার। কারণ তা’ যে না করে তাকে এরা একদম গেঁয়ো চাষা মনে করে।
তারা আমাদের পানসুপারি দিতে কখনও বাধা করত না; এ ব্যাপারটা খুব কেতা-দুরস্ত ভাবে সম্পন্ন হত। খুব নীচু গলায়, আদব মেনে, রাশভারী চালে আর নরম সুরে গল্পগুজব হত। পরস্পর কথা বলার সময় তারা কখনও একদম রাশ ছেড়ে দেয় না: তারা কখনও খুব বেশী চেঁচিয়ে কথা বালে না কি হাবভাবে বেসামাল হয় না। প্রায়ই তারা পরস্পর কানে কানে কথা বলে । তখন তারা কাধের চাদর বা ডান হাতখানা মুখের সামনে ধরে, পাছে তাদের নিঃশ্বাসে কারও অসুবিধে হয় সেইজন্য । অতিথি বিদায় নেওয়ার সময় তারা খুব আপায়ন করে এগিয়ে দিয়ে আসে।
বড়লোকের বাড়ীতে ভোজে খুব জাকজমক হয়। এই উপলক্ষ্যে তারা জামাকাপড় নাচগাঁন…এবং অন্যান্য বিলাস-ব্যসনে প্রচুর খরচ করে। বাড়ীর কর্ত্তা অতিথিদের সঙ্গে মাটিতে গালচের উপর বসে। সেখানে বাবুর্চি সবাইকে পরিবেশন করে। খাবারের মধ্য থাকে নানান ভাল রান্না, আচার আর ফল । ভাল খাওয়ার দিকে ওলন্দাজদের চেয়ে এদের নজর কম নয়।
রুটির বদলে এরা ভাত খায় । ভারতবর্ষের বেশীর ভাগ জায়গায়ই এই প্রথা চলতি। বাংলাদেশে গম হয় না এমন নয়। কিন্ত দেশের লোকের উপযোগী নয় বলে গম থেকে রুটি বানান এরা পছন্দ করে না। এক মুসলমানরা মাঝে মাঝে খুব পাতলা বিস্কুট [দেশী রুটি ] বানিয়ে খায়।
তারা মুরগী আর ছোট ছোট পশুপাখী নানাভাবে রেঁধে খোয় ।— [ পরিবেশনের পাত্রে রাখা ] খাবার তারা কখনও ,আঙুল দিয়ে ছোয় না। আর [ খেতে বসে] আঙুল চাটা তারা বেজায় নোংরামী আর বেয়াদবী মনে করে।
…ভোজ উপলক্ষ্যে—বিশেষ করে বাইজী আর বায়েনদের যখন তলব হয় তখন—, লাম্পটোর ছড়াছড়ি হয়। যদিও এইসব বাইজীরা সত্যিতে সাধারণ গণিক এবং নাচ দেখান’র চেয়ে লাম্পট্যের খোরাক জোগাতেই’ তারা বেশী আসে, তবুও তাদের আসাটা কেউ কিছু দোষের মনে করে না।
এইসব স্ত্রী লোকের সংস্পর্শ কেউ কিছু নিন্দার ত ননে করেই না, বরং ব্যভিচার নিবারণের একটা সুপথ হিসাবে দেখে। এই প্রথা শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতবর্ষের আরও অনেক জায়গায় চলতি আছে। এমন কি গণিকারা কতকগুলি সুবিধাও পায়। প্রত্যেক সহরে একটি বিশেষ পাড়ায় তাদের থাকবার জায়গা দেওয়া হয়।
মুসলমান, বেনে এবং আর সব জাতের লোক ইচ্ছামত এদের বাড়ী নিয়ে আসে আর তা ছাড়া তাদের বাড়ীতেও যায়| এরা বেশীর ভাগ নাকে কানে ছোট ছোট সোনার নাকড়ী পরে: আঙুলে আর হাতের নীচের দিকেও এই ধরণের গয়না পরে। এদের প্রায় সবারই বয়স অল্প আর এদেশের হিসাবে তারা দেখতেও ভাল । তারা ভাল নাচতেও জানে । তার ফলেই মুসলমানদের—ধারণা নাচওয়ালী আর বায়েনদের না ডাকলে–অতিথিদের পুরোপুরি আপ্যায়ন করা হয় না।
আশ্চর্যের বিষয়,—এই গণিকারা প্রায় সব জায়গায় বিশেষ করে পিপলিতে, বেশ সম্মান পায়। সেখানে [ পিপলিতে ] তাদের একটা আলাদা পাড়া আছে। তার রাস্তাগুলি খুব সরু । এইসব সরু গলির দু’ধার দিয়ে তাদের বাড়ী আর প্রতিটি বাড়ী অনেকগুলি ছোট ছোট ঘরে ভাগ করা।… তালা প্রতি সপ্তাহে কোতয়ালকে…কিছু খাজনা দেয়। এই খাজনা দেয় বলে তাদের একটা সঙ্ঘ হিসাবে মেনে নেওয়া হয়। এই সঙ্গে যারা ঢুকেছে তারা দ্বাড়া আর কাউকে এই বৃত্তি নিতে দেওয়া হয় না! । সব ব্যাপারেই এটি ঠিক অন্যান্য সঙ্ঘের মত: যদি তারা জানতে পারে যে সঙ্ঘে না ঢুকে কেউ গণিকাবুত্তি নিয়েছে, তবে তার কাছ থেকে তারা খেসারত আদায় করে। এই সব দুশ্চরিত্র স্ত্রীলোক তাদের মেয়েদের নিজেদের বৃত্তি শিক্ষা দেয়। ছেলেরা ভোজবাজী আর নাচ গান শেখে,… মেয়েরাও গাইতে শেখে…।
মুসলনানদের মধ্যে যারা বড়লোক তারা অনেক চাকর বাকর রাখে…। শুধু ঘারে না, বাড়ীর বাইরেও যাতে তাদের প্রচুর খেদমত করা হয় সেদিকে তারা খেয়াল রাখে । প্রতোকেই নিজের জাঁক দেখাতে চায়। ঢাকররা প্রতোকে নিজের কাজ করে। খোঁজারা মেয়েদের পাহারা দেয়। এ কাজ তাদের খুব হু’সিয়ার হয়ে করতে হয়ঃ এমন কি মেয়েদের কোনও পুরুষের সঙ্গে কথাও বলতে দেওয়া হয় না, এ আমি নিজেই দেখেছি। তাদের বাড়ীতে তাদের স্বামীদের সঙ্গে কোনও দরকারে আমরা কথা বলতে গেলে যদি মেয়েরা এসে দরজা খুলত তা’ হলে আমাদের কথার উত্তর না দিয়ে আমাদের দরজায় ফেলে রেখে তারা ঘরের ভিতর দৌড়ে পালাত।
কেউ কেউ তান্যান্য চাকর ছাড়া হরকরাও রাখে। তারা অনেকে বুকের সঙ্গে দুটি ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখে, যাতে সেই শব্দ শুনে আরও তাড়াতাড়ি ছুটতে পারে। (হরকরাদের মধ্যে] যারা সবচেয়ে চটপটে তারা চবিরশ ঘণ্টায় চল্লিশ কি পঞ্চাশ লীগ ঘেতে পারে। খুব ধনী লোকেরা কাঠুরে, পানিপাড়ে, পাল্কি-বেহারা এবং নানা কাজের জন্য আরও সব লোক রাখে।
কারও কারও হিন্দুস্থানী ধরণের বলদে-টানা গাড়ী থাকে। কিন্তু তারা ঘোড়া আর পাল্কি বেশী ব্যবহার করে…। পাল্কিগুলি এমন ভাবে তৈরী যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার ভিতরে ঢাকনী বা মশারীশুদ্ধ বিছানা রাখা যায়…।
সংক্ষেপে বলতে গেলে [পাল্কি ] জিনিষটা এতো সুন্দরভাবে তৈরী এবং তার ব্যবস্থা এত ভাল যে তার ভিতর শোওয়া-বসা থাওয়া-দাওয়া বেশ চলে এবং সমস্ত পথটা বেশ স্বচ্ছন্দে কাটিয়ে দেওয়া যায়। এমন কি পাল্কির ভিতর কেউ তার সঙ্গে কজন বন্ধুবান্ধব বা মেয়েদেরও…. নিতে পারে। পাল্কিতে মেয়েরা থাকলে তাদের যাতে কেউ দেখতে না পায় সে দিকে বিশেষ নজর রাখা হয়।
পথের দৈর্ঘ্য অথবা কর্ত্তার দেমাক অনুযামী পরম্পরতে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য ছ’জন কি আট জন বেহারা থাকে । তারা খালি পায়ে শক্ত মাটির পথ ধবে যায়। বর্ষাকালে পথ ভীষণ পিছল হয়। কাটাগাছ ঝোপ-ঝাড় সব কিছুর উপর দিয়ে তারা চলে । পাছে পাল্কিতে ধাক্কা লাগে দেই ভয়ে তারা ব্যথা পেলেও [ তাদের চলায় ] কিছু নড়চড় করে না। সাধারণতঃ সামনে দুজন আর পিছনে দুজন বেহারা থাকে… ।
তাছাড়া পাল্কির চারধারে বায়েন, পাহারাদার, বাবুর্চি, নফর, গোলামরা থাকে । তারা সব ঢাক, শানাই, হাতিয়ার, নিশান, খাবার-দাবার, তাবু এবং পথের সুবিধার জন্য আর যা কিছু দরকার বয়ে নিয়ে চলে।
পাল্কিতে বেশ তাড়াতাডি পথ এগোন যায়। চাকরবাকব আর কারিগরদের মত বেহারাদেরও দৈনিক মজুরী চার পাঁচ Sous-এর (Sous দ্বারা ফরাসি মুদ্রা কে নির্দেশ করেছেন লেখক, তবে ৫ sous দ্বারা মোঘল আমলে ১ গ্রাম রূপা পাওয়া যেতো। এ থেকে একটি পর্যবেক্ষণ সম্ভব যে, ঔপনিবেশিক শাসনের আগে ভারতীয় উপমহাদেশের মুদ্রা মান ইউরোপিয়দের তুলনায় বেশি ছিলো।– ঢাকাজিন সম্পাদকীয় নোট) বেশী নয়। তবু এমন মোটা মাইনে যারা পায় তারা আর সবার চাইতে ভাগাবান্ ! কারণ এমনও অনেকে আছে যাঁদের দৈনিক আয় দুই Sous। সাধারণ লোক খিচুডী আর ভাত খায়। তারা বাড়ীর ভিতরে রান্নাবাড়ি না করে, উঠান বা তার সঙ্গের কোনও জায়গায় করে। কারিগর, দর্জি, চামার, তাঁতি–এদের লোকে হেয় মনে করে।
সুবাদার (? ফৌজদার?) অপরাধীদের বিচার করেন আর শাস্তি দেওয়ার ভার থাকে কোতয়ালের উপর । ছোটখাট মামলা-মোকদ্দমার বিচারও কোতয়ালই করে। পদস্থ কি ধনী লোকদের শাস্তি দেওয়ার বেলা সাধারণতঃ তাদের গায়ে হাত পড়েনা; ঝকিটা তাদের টাকার উপর দিয়েই যায় । যারা ছোটখাট অপরাধ করে তাদের ঘাড়ে-পিঠে চাবুক মারা হয়। বাড়ীতে সিদ দিলে, রাহাজানি করলে বা বেশী দামী কিছু চুরি করলে আরও কঠিন শাস্তি দেওয়া হয়। এসব জায়গায় অপরাধ অনুযায়ী অপরাধীর গর্দান যায়, নয় ত তাকে তলোয়ারের এক কোপে দু-টুকরো করে ফেলা হয়ঃ নয়ত পা কি হাত অথবা হাত-পা দুই-ই কেটে ফেলা হয়। এক অপরাধীর প্রচুর টাকা থাকলে কাজীকে ঘু’য দিয়ে শান্তি রদ করতে পারে।
[ এদেশে ] ভ্রমণ করতে হলে যে-সব নির্জন পথ দিয়ে বাধ্য হয়ে যেতে হয়, সেগুলি খুবই বিপজ্জনক। এসব জায়গায় আনেক চোরের দল থাকে যাত্রীরা দলে যথেষ্ট ভারী না হলে এদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া কঠিন। বাংলার মুসলমানদের হাতিয়ারের মধ্যে [ প্রধান ] তীর-ধনুক আর গাদা-বন্দুক। ঘোড়-সওয়ারদের থাকে তীর-ধনুক, তূণ, গলার সঙ্গে ঝুলান একটা ঢাল আর হাতে একটা ছোট বল্লম, বল্লমটি তারা বেশ নিপুণ হাতে চালাতে পারে। তাদের পাশে [ঝুলান ] থাকে একটা তলোয়ার আর একটা ছোরা। কারও কারও লোহার বর্ম পরা থাকে। পদাতিকদের হাতিয়ার তীর-ধনুক আর লম্বা বর্শা। [ যুদ্ধের সময়] সৈন্যরা কথনও সামনের বাহিনী, পিছনের বাহিনী এ-সব ভাবে সাজান থাকে না। শক্রর সামনে এলে তারা প্রায় বিশুঙ্খলভাবে পরস্পরের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। অন্ততঃ তাদের মধ্যে ‘ব্যাটালিয়ন’ প্রভৃতি কোনও ছোট ছোট ভাগ থাকে না। ফলে প্রায়ই তাদের তিতর বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয় এবং সহজে আর খুব শীগগিরই তারা হেরে যায়।
কেউ কেউ যুদ্ধের সময় পিঠে হাওদা-বাঁধা হাতী সঙ্গে নিয়ে যায়। তার উপর তীর [ধনুক] আর বর্শা হাতে তিনচার জন বসতে পারে; কখনও কখনও ছোট একটা কামানও থাকে । ফৌজদের বাঁচান আর শত্রুদের ভিতর বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার জন্য সৈন্যবাহিনীর সামনে একটা উচু দেয়ালের মত করে হাতী গুলি সাজান হয়।
কিন্তু এই বিরাট জীবগুলি ব্যবহারে একটা অসুবিবিধা আছে। আগুনের গোলা দেখলে এরা বেজায় ভয় পায় আর হিন্দুস্থানে যুদ্ধে এইসব গোলা খুব বেশী ব্যবহার হয় -তখন তারা শত্রুর দিকে না এগিয়ে পিছন ফিরে নিজেদের সৈন্যর ভিতর ঝাপিয়ে পড়ে সব ছত্রছান করে দেয়। তখন কেউ তাদের ঠেকাতে পারে ন।। ফলে এক কামান টানা ছাড়া আর কোনও কাজে আজকাল বিশেষ হাতী ব্যবহার করা হয় না; এই কাজের পক্ষে তারা খুব উপযুক্ত । মুসলমানদেরও কামান আছে, তবে তা আমাদের দেশের লোকদের মত ভালভাবে ব্যবহার করতে পারে না। তারা বারুদ তৈরী করে, তবে তা’ও আমাদের মত ভাল নয় । যুদ্ধে সৈন্যদের উৎসাহ দেওয়ার জন্য তারা ঢাক, তুরী-ভেরী এসব বাজায়।
সেনাপতিকে লোকে বলে বড় নবাব [? ] ৷ মস্ত করে অনেকখানি জায়গা জুড়ে তার তাঁবু পড়ে । থাকবার জায়গাগুলির বন্দোবস্ত ভালই থাকে: সহরের রাস্তার মত করে তাঁবুগুলি সুশৃঙ্খল ভাবে সাজান থাকে । সেখানে সবরকম খাবার কিনতে পাওয়া যায় । বাদশার— অথবা বাদশা উপস্থিত না থাকলে সেনাপতির—তাঁবু আর সব তাঁবুর চেয়ে উঁচু করে পাতা হয়; এটা ছাউনীর মাঝখানে থাকে আর তার চারপাশে অনেকটা জায়গা খালি রাখা হয়। লড়াইর সময় এই তাবু ছেড়ে কোনও চূড়ান্ত মীমাংসার জন্য সামনা-সামনি যুদ্ধ করতে তারা বড় একটা বের হয়ে আসে না। তার চেয়ে তারা ছোট-ছোট দল পাঠিয়ে শক্রর রাজ্যে লুঠতরাজ করাই বেশী পছন্দ করে। এমনি ভাবে তারা পরস্পরকে সন্ধি করতে বাধ্য করে।
মুসলমানদের মধ্যে কেউ মারা গেলে তার স্ত্রী-পুত্র, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী তিন দিন ধরে খুব কান্নাকাটি করে। তারপর তারা মুতের সম্মানের জন্য এক ভোজ দেয়। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব চেনাজানা সবাই কবর দেওয়ার সময় উপস্থিত থাকে । মৃতদেহটি স্নান করিয়ে সাদা কাপড়ে মোড়া হয়; এই কাপড়টির ভিতর নানা সুগন্ধি দিয়ে তারা সেলাই করে দেয়। খাঁটিয়ার মত একটি কফিনে করে তারা [ মৃতদেহটি ] নিয়ে যায়।
তখনও বাড়ীতে যে-সব মেয়েলোক জড় হয় তারা খুব কান্নাকাটি করতে থাকে । দু-তিন জন মোল্লামৌলভী অন্তোষ্টিক্রিয়া শুরু করে। তারা আস্তে আস্তে মন্ত্র পড়তে পড়তে শবের চারপাশে কয়েকবার ঘোরে, তারপর আট-দশ জন সাদা-কাপড়-পরা মুসলমান শবটি নিয়ে কফিনে রাখে, তারপর [কফিন } তুলে কবরখানায় নিয়ে যায়। আত্মীয়-স্বজনরাও সাদা কাপড় পরে দুজন দুজন করে সারি দিয়ে খুব শান্ত সুশৃঙ্খল ভাবে পিছন পিছন হেঁটে যায়। কেউ কেউ লিখে গেছে যে এই সময় তারা গান করে। তবে এরকম আমি নিজে কখনও দেখিনি বা শুনিনি বলে কথাটা কতদূর সত্যি বলতে পারি না।
কবরখানায় পৌছলে সেখানে ইট-সুরকির তৈরী ছোট একটি কবরে শবদেহটি কাঠের পাটাতন দিয়ে ঢেকে ডানকাতে দক্ষিণদিকে পা আর পশ্চিমদিকে মুখ দিয়ে রাখা হয়। তারপর সেটার উপর মাটি ছড়িয়ে দেওয়া হয় । তারপর সম্মিলিত সকলে হাত ধুতে যায়। এজন্য একটি বিশেষ জায়গা তৈরী থাকে। তারপর মোল্লা আর তাদের সহকারীরা গোল হয়ে দাড়িয়ে, মাথা ঢেকে, হাতজোড় করে আকাশের দিকে মুখ করে মৃতের আত্মার জন্য সংক্ষিপ্ত একটি প্রার্থনা করে। প্রার্থনা শেষ হলে সবাই [ সারিতে ] নিজের নিজের জায়গায় ফিরে যায় এবং শোকার্ত. আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে তাদের বাড়ী পর্যন্ত যায়। তারপর গম্ভীর মুখে সবাই বাড়ী ফিরে যায়।

